রবিবার, ৬ মে, ২০১২

নাইফ ইন দ্য ওয়াটার বা একক মানুষের মনের গোপন খেলা


“সাধারণ বা নিয়মমাফিক প্রেম মোটেও আকর্ষণীয় কিছু নয়। আপনি আশ্বস্ত থাকতে পারেন যে এটা আজগুবী রকমের বিরক্তিকর!”- রোমান পোলানস্কি



রোমান পোলানস্কি ভর্তি হয়েছিলেন পোল্যান্ডের লডয্‌ ফিল্ম স্কুলে। সেই কালে পূর্ব ইয়োরোপে হাতে গোনা কিছু ফিল্ম স্কুলে ছিল যা রাষ্ট্রায়ত্ত হওয়া সত্ত্বেও সিনেমা শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিত,অহেতুক ফাপড় দালালি না করে;এক্ষেত্রে লডয্‌ স্কুলের নাম উল্লেখযোগ্য। তো, পোলানস্কি ছাত্র থাকাকালীন দ্বিতীয় বছরে তিনি একটা শর্ট ফিল্ম করেন ‘টু মেন এ্যান্ড আ ওয়ার্ড্রোব’। একটা শর্ট ফিল্মই এই যুবককে চলচ্চিত্র দুনিয়ার আগামীদিনের এক প্রতিভাসম্পন্ন পরিচালকের পরিচিতি এনে দিন। ছাত্রজীবন শেষ করে চলে গেলেন প্যারিসে। ১৯৬২-র গোড়ায় ফিরে এলেন পোল্যান্ডে। এক তরুণ তাঁর জন্য লিখেছে একটা চিত্রনাট্য। ফিল্ম স্কুলের অধ্যাপক ‘কামেরা’ নামে ফিল্ম ইউনিট থেকে ছবিটি প্রযোজনা করতে চাইলেন। সে সিনেমার নাম ‘নাইফ ইন দ্য ওয়াটার’ (১৯৬২)। এই ছবিতে চিন্তার স্বাধীনতা এতদুর গেছে যে বিশ্বাসই হয় না রাষ্ট্রায়ত্ত কোনও শিল্পকলায় এরকম স্বাধীনতা সম্ভব হতে পারে। এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন জেরঝি স্কোলিময়স্কি। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পোল্যান্ড বা পোলিশ ছায়াচিত্রের ইতিবৃত্তে ‘নাইফ ইন দ্য ওয়াটার’ পয়লা সিনেমা যেখানে যুদ্ধের বদলে একক মানুষ আখ্যানের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সাদামাটাভাবে,নাইফ ইন দ্য ওয়াটার তিনজন মানুষের (প্রেম,আকাঙ্খার) গল্প। বয়স্ক ক্রীড়া সাংবাদিক আন্দ্রেয,তার বউ ক্রিস্টিনা এবং পাহাড়,বনবাদাড় দাপিয়ে বেড়ানো অজ্ঞাতনামা এক লক্ষ্যহীন,প্রেমহীন,স্বাধীন কিশোর।

কাহিনীচিত্রে আমরা দেখতে পাই, আকর্ষণীয় নব যৌবনা ক্রিস্টিনা আন্দ্রেজকে আরোহীর আসনে বসিয়ে নিজে চালকের ভুমিকা নিলে, আন্দ্রেজ তাকে ঠাট্টার ছলে বিদ্রুপ করতে ছাড়ে না। আন্দ্রেঝ বলেই বসে তোমার যে থরহরি মার্কা গাড়ি চালানো কখন না জানি গাছ কে পাশ কাটাতে গিয়ে গরুর উপর গিয়ে পড়...বলতে না বলতেই এক কিশোর তাদের গাড়ির সামনে কোত্থেকে যেন উড়ে এসে পড়ে। বিব্রত হতভম্ব দম্পতি কিঞ্চিত আহত কিশোরকে সামনে নামিয়ে দেবে বলে গাড়িতে তুলে নেয়। এদিকে, ক্রিস্টিনাকে দেখা মাত্রই অজ্ঞাতনামা কিশোরটির আপাত নির্লিপ্ত চোখের বারান্দায় ক্রিস্টিনার প্রতি সেক্স স্টার্ভড সৈন্যের কামনা যেন দপ করে জ্বলে উঠে! আন্দ্রেঝের হৃদয়ের বীপ্‌-এ ঢিপ্‌-ঢিপ্‌ করে উঠে। এসব খেয়াল করেও আন্দ্রেঝ ছোকরাটিকে তাদের নৌবিহারের সাথী হতে বলে,ছেলেটিও বলে চলেন যাই...সমুদ্রের খোলা হাওয়া ইয়টের পালে লাগিয়ে ভেসে চলে তারা। মৌন কিশোরের মগজের কারাখানায় ক্রিস্টিনা আর আন্দ্রেঝের পাশে বসা ক্রিস্টিনা_তো, এক ক্রিস্টিনা কে নিয়ে দুই পুরুষের পৌরষত্ব প্রমাণের ষাড়ের লড়াই বেঁধে যায়। এ সূত্র ধরেই কাহিনী এগিয়ে যায় পরিণতির দিকে।

নাইফ ইন দ্য ওয়াটার হিচককের লাইফবোট এবং স্পিলবার্গের ডুয়েল-এর মত একটি সিনেমা হলেও হতে পারতো! ছায়াচিত্রের প্রেক্ষিত ও প্রস্তাবনার জায়গা থেকে বারংবার একটি অস্থিরসংকল্প বা সাস্পেন্স থ্রিলার হতে হতে ‘নাইফ ইন দ্য ওয়াটার’ প্রেম-হিংসা-ঈক্ষণকামের জারন-বিজারনে এক আত্মগত ছবি হয়ে উঠেছে।
অভিষেক সিনেমা হেতু হয়তো পোলানস্কি ছায়াচিত্রের পরতে পরতে হাজির থাকা জায়মান স্পর্শগ্রাহ্য নাটকীয় মূহুর্ত গুলিকে শেষতক এক সুতোয় গ্রন্থিবদ্ধ করে উঠতে পারেন নাই,ফলে এটি হয়ে উঠেছে জ্ঞাত মুহুর্তের এক দোলাচাল যার যে কোনটিই আমাদের নিয়ে  যেতে পারে চরম বিশৃংখল কোন পরিণতির দিকে...

জারঝি লিপম্যানের চমৎকার ক্যামেরা শৈলী সীমিত স্পেস,জলজ লোকেশন ও তীব্র পরিস্থিতির এই আখ্যানে বেজে যায় যুদ্ধবিরতির কুচকাওয়াজের মতন। আর আখ্যানের ক্ষমাহীন মেজাজের বিরুদ্ধে আবহ সঙ্গীতে ক্রিজিস্তফ কমেডার কড়কড়ে জ্যাজ মিউজিকের ব্যবহার সিনেমাকে আরও জমকালো করে তুলেছে।

ব্যক্তি মানুষের আদলে গল্প বলা এই সিনেমায় নির্মাতা মূলত দেখাতে চেয়েছেন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার লড়াই। বলা যায় তিনি তাতে সফলও হয়েছেন কেননা,এই সিনেমা তাকে নিয়ে হাজির করে অস্কারে। এটি ১৯৬৩-র অস্কারে ভিনদেশী সিনেমার শাখায় মনোনীত হয়েছিল। প্রথম ছবি দিয়ে এতবড় স্বীকৃতি এর আগে পেয়েছিলেন সিনেমা গুরু অরসন ওয়েলস তার ‘সিটিজেন কেইন’-র জন্য।

আর কিছু না হোক,মিনিম্যালিস্ট ঘরানার চমৎকার সিনেমা হিসাবে ‘নাইফ ইন দ্য ওয়াটার’ বেঁচে ফিরবে দর্শকদের চোখে-মুখে দীর্ঘকাল_এ বিষয়ে অমত কার!

স্পারটাকাস বা ক্রীতদাসের হাসি


“আমাদের জন্য বা কারো জন্যও এই পৃথিবীতে হয়তোবা একরত্তি শান্তি নাই। শান্তির সন্ধান আমার অ-জানা। কিন্তু আমি জেনে গেছি যে, যতক্ষণ দম আছে,ততক্ষণ আমাদের জীবনের তরে সৎ থাকার দায় আছে।” ~স্পারটাকাস

গুরু স্ট্যানলি কুবরিকের ‘স্পারটাকাস’ (১৯৬০) স্পষ্টতঃ আলো দিয়ে লেখা ঐতিহাসিক সিনেমার চেয়ে বেশি কিছু। এটি শুধু অস্কারজয়ী অতুলনীয় সিনেমাই নয় বরং সিনেমার ইতিহাসে দুর্লভ মাস্টারপিসগুলির মধ্যে একটি। বিশ শতকের সিনেমাটোগ্রাফির ইতিহাসে ‘স্পারটাকাস’ আইওকনও বটে! এই সিনেমাটি জীবন,ইতিহাস ও দর্শনের একটি কারনামা। ‘স্পারটাকাস’ কুবিরিকের সিনেমা জীবনে একটি পরিবর্তকালীন মূহুর্ত...তাঁর অত্যন্ত ব্যক্তিগত যুদ্ধবিরোধী সিনেমা ‘পাথ্‌স অভ গ্লোরি’ থেকে শুরু করে একজন স্বনাম খ্যাত কুবরিক হয়ে উঠার যাত্রাপথে স্পারটাকাস একটি সূচনাবিন্দু। কিন্তু কুবরিকের সাথে এই সিনেমার যোগসূত্র স্থাপিত হয় সিনেমার কাজ শুরু হবার এক সপ্তাহ বাদে;কেননা, প্রযোজনা সংস্থা ব্রিনা প্রোডাকসন্স পূর্ব নির্ধারিত পরিচালক অ্যান্থনি মান কে বরখাস্ত করলে, ব্রিনা প্রোডাকসন্স-র মালিক ও সিনেমার নাম ভূমিকা রূপায়নকারী কির্ক ডগলাস কুবরিককে সেটে উড়িয়ে নিয়ে আসেন। সিনেমার ইতিহাসে এই ছবির বিবিধ কারণে অন্যন্য স্থান অধিকার করেছে আপন মাধুর্যে তবে কুবরিক সর্বদাই একে একটি অ-ব্যক্তিগত প্রকল্প হিসেবে দেখেছেন এবং একই সাথে প্রযোজনা সংস্থার সর্বৈব নিয়ন্ত্রণের দরুন এক পর্যায়ে সিনেমাটির উপর দাবিও ত্যাগ করেছেন।


যাহোক, পর্দার পেছনের এসব কথামালার দরুন পর্দার স্পারটাকাসের জৌলুশ যে একফোঁটা ভাঁটা পড়েনি তা বোঝা যায় যখন ১৯৯১ সনে এই ছায়াচিত্রের পুনঃপ্রচালন বা প্রদর্শকালে হল ভর্তি দর্শকের আনাগোনার মাধ্যমে।

১৯৬০ সনে যখন সিনেমাটির কাজ হাতে নেওয়া হয় তখন পুরো মার্কিন মুল্লুক কমিউনিস্ট জ্বরে আক্রান্ত বা বলা যায় সিনেটর যোসেফ ম্যাককার্থির অ্যান্টি-কমিউনিস্ট বিরোধী আন্দোলনের তোড়ে কমিউনিউজম দরদীদেরও বিনা কারণে জেলে পোড়া হচ্ছে। ঠিক তক্ষণ ব্রিনা প্রোডাকসন্স কমিউনিস্ট ভাবধারার লেখক হাওয়ার্ড ফাস্টের স্পারটাকাস উপন্যাস অবলম্বনে এই সিনেমার প্রকল্প হাতে নেয়। পরিচালক হিসেবে কির্ক ডগলাসের প্রথম পছন্দ ছিল ডেভিড লীন (লরেন্স অভ অ্যারাবিয়া) কিন্তু লীন আগ্রহ না দেখানোও তারা ভাড়া করে ঐকালের তুখোড় ওয়েস্টার্ন সিনেমা নির্মাতা অ্যান্থনি মান কে কিন্তু তিনিও এই বিশাল বাজেটের রঙ্গীন সিনেমা নির্মাণ প্রকল্পের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়লে ডাক পড়ে কুবরিকের।

ডাল্টন ট্রাম্বোর চিত্রনাট্যে রচিত ‘স্পারটাকাস’-র কাহিনী গড়ে খ্রীষ্টপূর্ব ১ম শতকে দখলীকৃত গ্রিস থেকে ধরে আনা ক্রীতদাসদের জোর করে গ্ল্যাডিওটার বানানো ও একজন দাসের এই প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা ও প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। তবে জয় হয় রোমান শক্তির,তারা কঠোর হস্তে রাষ্টে উত্তেজনাকারী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দৃষ্টান্তমূলকভাবে দমন করেন!! কিন্তু,তাতে কি...পরাজয়ে ডরে না বীর!

স্পারটাকাসের আবছায়ায় মূলতঃ লেখক-নির্মাতা বলতে চেয়েছেন মজলুমের বিরুদ্ধে জালিমের সংগ্রামের ইতিহাস...যেখানে সত্যের জয়-ই শেষকথা। যোদ্ধা স্পারটাকাস হয়তো চির নিদ্রায় ঢলে পড়েছে হাটুভাঙ্গা নদীর বাঁকে, দেখে যেতে পারেনি স্ব-ভুমির মুক্ত আকাশ কিন্তু তার সংগ্রামী বন্ধুদের ঠিকই দেখিয়ে দিয়ে গেছেন মুক্তির আলপথ !

‘স্পারটাকাস’ আমাদের মানসলোকে আজো ভাস্বর হয়ে আছে কির্ক ডগলাস,লরেন্স অলিভার,পিটার উস্তিনভ্‌,চার্লস লফটন,জঁ সিমন্স ও টনি কার্টিসের পর্দা চিবিয়ে খেয়ে ফেলা দুর্দান্ত অভিনয় গুণে; আরো আছে...যেমন- এই সিনেমার মধ্যে দিয়ে প্রকৃতার্থে হলিউডে টেকনিকালার বা রঙ্গীন সিনেমা তথা ক্ল্যাসিক যুগ থেকে আধুনিক যুগে পদার্পণ করে। পাশাপাশি কুবরিক ক্ষত নির্গত চাপ চাপ রক্তস্নাত,জমাট বাঁধা বীভৎসতাকে বিনোদন হিসেবে পর্দায় প্রথম উপস্থাপন করেন। আর সিনেমাটগ্রাফার রাসেল মেটি সেই বছর অস্কার বাগিয়েছিলেন। আরেকটি বিষয় না বললেই নয় এই সিনেমার ভিতর দিয়ে আমরা পর্দায় প্রথম হাজির হতে সমকামিতার মত স্পর্শকাতর বিষয়টি।

তুলনামূলকভাবে ‘বেনহার’-এর চাইতে আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ হলেও স্পারটাকাস স্ট্যানলি কুবরিকের ক্যারিয়ারে একটি দুর্বলতম সিনেমা।

তারপরও,স্পারটাকাস দেখা শেষ হলে পর যেন মনে হয় ‘আমি-ই স্পারটাকাস’ !!

যে ছবি যুদ্ধের কথা বলে



বাচ্চাকালে একটা লাইন প্রায়ই শুনতাম-‘ট্যারম ট্যারম যুদ্ধ হবে তোমার সাথে আমার সাথে। বোম ফালাইলো জাপানি,বোমের মধ্যে গুমা সাপ,ব্রিটিশ কয় বাপ রে বাপ!’ তখন যুদ্ধ না বুঝলেও এটুকু বুঝতাম যুদ্ধ মানে একটা অ্যাকশন সিনেমা;আরো-পরে বুদ্ধি হাঁটু থেকে উপরের দিকে উঠতে থাকলে বুঝতে শিখলাম যুদ্ধের অ্যাকশনের বীভৎসতা,মানবতার অপমান,পাশবিকতার সাতকাহন কি ও কত প্রকার!! হতে পারি বাংলা মায়ের অ-মানুষ সন্তান কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ’৭১-র পঁচিশে মার্চের বর্বরতা,গণহত্যা বা একজন জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ আমি,আমরা কিভাবে ভুলতে পারিঅনেকপর সিনেমার টানটান মায়াবী পর্দায় যুদ্ধের রকমফের দেখতে দেখতে উপলব্ধি করলাম যুদ্ধ মানে শুধু শত্রু—শত্রু খেলা বা বাতাসে পোড়া বোমা-বারুদের গন্ধ নয় বরং জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার হলুদ খামে ভরা ঠিকানাবিহীন একটি চিঠি;ঠিকানাবিহীন এই কারণে যে,যুদ্ধ সব দেশেই নির্মমতার,প্রতিরোধের চিহ্ন তাই আকাশের ঠিকানায় লেখা এই চিঠির প্রাপকের দেশ বিশ্ব ব্রম্মাণ্ড। সেই প্রাপ্তিসূত্রেই পাওয়া পাঁচটি হৃদয় আদ্র করা,চিন্তা জাগানিয়া সিনেমা নিয়ে এখন বাকি কথা হোক পাঠক আপনাদের সাথে—

প্যারাডাইস নাও (২০০৫,ফিলিস্তিন)
দুই বাল্যবন্ধু সাইদ ও খালিদের একটি চরমপন্থী দলের হয়ে ইজরাইল বিরোধী আদমবোমা হয়ে উঠার প্রস্তুতি,যাত্রা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের দৃষ্টিকোণ এবং টানাপোড়ন কে ঘিরে নির্মাতা হানি আবু-আসাদ সিনেমাটির গল্পের জাল বুনেছেন। আদম বোমারু দুই বন্ধুর তাল আভিভ যাত্রা এবং কোন এক গলামালের কারণে পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া,যার মধ্যে একজন থাকে লক্ষে অবিচল আর অপরজন কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে রয়। বিতর্কিত এ সিনেমায় নির্মাতা দেখাতে চেয়েছেন যে একটি নামহীন রাজনৈতিক সন্ত্রাসীচক্র কিভাবে বন্দিত্বের শেকল,আগ্রাসনের থাবা থেকে দেশকে উদ্ধার উন্মুখ যুবকদের আবেগ ও প্রতিশোধ স্পৃহা ব্যবহার করে ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যে। ‘প্যারাডাইস নাও’-এ সামরিক আগ্রাসনে জিম্মি মানুষ তথা মানবাধিকারের অবিস্মরণীয় প্রতিকৃতি অংকন করার হয়েছে সুললিত ভাবে।

গ্রেভ অভ দ্য ফায়ারফ্লাইস (১৯৮৮,জাপান)
মার্কিন সমালোচক রজার এবার্টের মতে-“এটি একপ্রকার মানসিক অন্তর্যাত্রা যা আমাদের এ্যানিমেশন মুভির শক্তি ও চেতনার আরশ কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়।” কথাগুলি ১৯৮৮ সনে ইসাও তাকাহাতা নির্মিত ‘গ্রেভ অভ দ্য ফায়ারফ্লাইস’ সম্পর্কে এবার্ট বলছিলেন। সেৎসুকু আর সেইতা নামের দুই ভাই-বোন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানে বাস করতো। এয়ার রেইডে মা মারা গেলে তারা বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের দ্বার ঘুরে আশ্রয়ের বদলে অপমানের ঝুলি নিয়ে শহর ছেড়ে বাইরে চলে আসে এবং একটি পরিত্যাক্ত বাড়িতে আশ্রয় খুঁজে নেয়যুদ্ধ অবস্থায় খাদ্য সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়লে তাদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ দুরহ হয়ে যায় এবং ক্ষুৎপিপাসায় তিলে তিলে মৃত্যুর কালে তাদের আনন্দের একমাত্র উপায় হয় জোনাক পোকার ঝিকিমিকি। এটি শুধু যুদ্ধের কোপে পড়া দুই শিশুর চোখে জল আনা গল্পই না বরং পরম ঘৃণা,সহানুভুতি,দুঃখময়তা এবং এরকম আরো অনেক প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সুপ্ত আবেগের যুদ্ধবিরোধী বিরল চিত্রমালাও বটে

স্ট্যাল্যাগ ১৭ (১৯৫৩,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
হলিউডের স্বর্ণালী যুগের কমেডি ও স্যাটায়ার সিনেমার ওস্তাদ বিলি ওয়াইল্ডার যখন যুদ্ধ ভিত্তিক সিনেমা করেন তাতে হাস্যরস-বিদ্রুপের তীক্ষ্ণতা থাকবে না তা হবার নয়। আপাত বাস্তববাদী এবং প্যারডি ভঙ্গীতে যুদ্ধকে কতিপয় অসুস্থ মানসিকতার মানুষের কিচ্ছা বানিয়ে ছেড়েছেন স্ট্যাল্যাগ ১৭ ছবিতে। এই ছবির কেন্দ্রে আছে একদঙ্গল মার্কিন বিমান সেনা যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জার্মানদের হাতে বন্দী শিবিরে কয়েদ। আর এরকম এক দমবন্ধ করা নিম্নচাপসম পরিস্থিতিতে দম ছেড়ে বাঁচতে হলে হাসি-তামাশা ছাড়া উপায় বা কি! তাই এমন ঘনঘোর দুর্যোগের মাঝেও দেখি কয়েদিরা হাসছে,তামাশা করছে। কিন্তু,বিপত্তি ঘটে তখনই যখন দুই জন বিমান সেনা পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। কেননা,এই গোপন শলা পরামর্শ ঘরের মানুষ আর দেওয়াল ছাড়া কাকাপক্ষীটিরও টের পাবার কথা নয়। আর সিনেমার শুরু এখানেই...বিলি ওয়াইল্ডার পাকা রসুইয়ের মতন নাটকীয় ঢং-এ প্লট,সাব প্লটের এমন সমাবেশ-বিন্যাস করেছেন যে পর্দা থেকে চোখ ফেরানোই দায়। তবে,হাস্যরঙ্গ যতই থাকুক না কেন শত্রু বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের দৃশ্যমালা উপস্থাপন করেছেন সংবেদী মন নিয়ে।


ব্যালাড অভ আ সোলজার (১৯৫৯,সোভিয়েত ইউনিয়ন)
যুদ্ধের ডামাডোল কি আমাদের মাঝে যোগাযোগের সংকট তৈরি করে নাকি আরো যোগাযোগ ঘনিষ্ট করে তোলে...এই অনুসিদ্ধান্ত কে সামনে রেখে একজন তরুণ সৈনিকের ঘরে ফেরার গান দেখি আমরা গ্রেগর চুখরাইয়ের ব্যালাড অভ সোলজার সিনেমায়। যে ঘরের ফেরার গানে আছে কুসুম কুসুম ভালবাসার গল্প,আছে একটি দম্পতির অঙ্গীকারবদ্ধ প্রেমের কথন আর আছে সন্তানের তরে মায়ের অপত্য স্নেহের জবানবন্দী। যুদ্ধের পটভূমিতে এমন মিঠা সম্পর্কের আখ্যান আমরা কদাচিৎ দেখে থাকি। বলতে দ্বিধা নেই যে, ব্যালাড অভ আ সোলজার শুধু একটি সিনেমা-ই নয়,একটি অভিজ্ঞতাও বটে।

আন্ডারগ্রাউন্ড (১৯৯৫,যুগোস্লাভিয়া)
এমির কুস্তেরিকার দুর্দান্ত পরিচালনা আর ডুসান কভাকসিভিচ এর অনবদ্য চিত্রনাট্যের কারণে ১৯৯৫ সনের কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম ডি’অর জিতে নেয় আন্ডারগ্রাউন্ড। আন্ডারগ্রাউন্ড শুধু যুদ্ধের ছবি নয় বরং আরো বেশি কিছু । একধরনের পারলৌকিক আবেশ ছড়িয়ে আছে এর পরতে পরতে। এটি যত না বলকান অঞ্চলের যুদ্ধ নিয়ে তার চেয়ে বেশি যুদ্ধোত্তর কালে মানবের হিংস্রতা-বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে। আর সেই হিংস্রতা-বিশ্বাসঘাতকতা যদি হয় বিজয়ীদের? তবে তা দেখতে কেমন হয় তাই নির্মাতা তীব্র প্রহসন ও মৃদু পরাবাস্তবতার মোড়কে হাজির করেছেন এই ছবিতে। প্রখ্যাত সমালচক ডেব্‌রাহ ইয়ং বলেছিলেন-“ফেদিরিকো ফেল্লিনি যদি যুদ্ধের ছবি বানাতেন তা আন্ডারগ্রাউন্ডের অনুরূপ হতে পারতো।”

সিনেমা যখন প্রামাণ্য দলিল হয়ে আমাদের কাছে আসে তখন আমাদের দায় থাকে সেই দলিলের সংরক্ষণ করা,তা আমল করাআর তা যদি আমরা নিতেই পারি তবে সিনেমা-ই হোক যুদ্ধবিরোধী হাতিয়ার।

চলে গেলেন একজন সিনেমাওয়ালা





বাষট্টি বছর বয়সেও যিনি ছিলেন চলচ্চিত্র ভাবনায় বুদ তরুণদের দুর্দান্ত বন্ধু,মৃত্যুর আগেরদিন পর্যন্তও যার ব্যস্ততা ছিল ফেডারেশন অভ ফিল্ম সোসাইটিজ,বাংলাদেশ-কে ঘিরে । বাংলাদেশের সিনেমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত নিয়ে ছিল যার সবসময়ের ভাবনা ও কথোপকথনের বিষয়। তিনি দেশের সফল শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনীর ‘ নির্মাতা বাদল রহমান ।
সভাপতি হিসাবে তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতাতেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদগুলোর কর্মকান্ড ও সস্কৃতিতে পরিবর্তন এসেছিল । চলচ্চিত্র সুংসদ আইন বাতিলের মধ্য দিয়ে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন গণতান্ত্রিক ও চেতনার পক্ষে ।

চিরতরুণ বাদল রহমানের মনে বয়স তেমন ছাপ ফেলতে পারেনি । তরুণদের যে কোন উদ্যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে বাদল ভাই আসেননি এমনটা হয়নি । সিনেমা বিষয়ক যে কোনো তথ্যের ব্যাপারে তিনি চিলেন চলন্ত বিশ্বকোষ । শিশুতোষ চলচ্চিত্র নিয়ে একটি গবেষণার কাজে তাকে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পেয়ে তার প্রমাণ পেয়েছি নিশ্চিতভাবে ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্রসংসদের যেকোন প্রয়োজনে বাদল ভাই হাজির হতেন, প্রিয় টি.এস.সি. চত্বরে। দেশে একটি ফিল্ম ইন্সটিটিউট না থাকার দুঃখ নিয়ে একসময় নিজেই উদ্যোগী হয়েছিলেন । কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার কথা বলেছেন ।সবশেষে কিছুদিন আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ফিল্ম ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি আদায় করে ফিরেছিলেন হাসিমুখে ।

বাংলাদেশের সিনেমার ভিত নির্মাণের যতটুকু উদ্যোগ তার পুরোভাগের নামটি বাদল রহমানের বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা, প্রথম চলচ্চিত্র অনুধাবন কর্মশালা আয়োজন ও ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ প্রতিষ্ঠা সেসব কাজের কয়েকটি দৃশ্যমান উদাহরণ ।

নির্মাতা, সম্পাদক, চলচ্চিত্র সংগঠক বাদল রহমানের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৪ঠা জুন। তিনি ভারতের পুনা ফিল্ম ও টিভি ইন্সটিটিউট থেকে চলচ্চিত্র-সম্পাদনার উপর ডিপ্লোমা লাভ করেন। তার সিনেমাজীবন এর সূত্রপাত টিভি থেকে, তিনি বিটিভির প্রযোজনা সহকারী ছিলেন। সেখানে তিনি সাক্ষাতকার ভিত্তিক একটি অনুষ্ঠান প্রযোজনা করতেন, যা নিয়ে একটি স্মৃতির কথাও বলতেন প্রায়ই ।

“একবার সেই অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন জহির রায়হান । সেটে ঢুকেই তিনি আলোকসজ্জা বদলে ফেললেন । দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখলাম,কিন্তু কিছুই বলতে পারছিনা ।জহির রায়হান বলে কথা ।” জহির রায়হানের হাত ধরেই বাদল রহমানের সিনেমাজগতে পথচলা শুরু ।

এমিলের গোয়েন্দা বাহিনীর বহুদিন বাদে বহুদিন পর তিনি শিশু একাডেমীর প্রযোজনায় নির্মান করেন ‘ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ’ ছবিতে তুলে আনলেন একজন শিশুর চোখে মুক্তিযুদ্ধ কেমন ।

শারীরিক নানা জটিলতার কারণে সুহৃদরা বার বার শরীরের প্রতি যতœবান হতে বললেও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্রই পুনরুদ্যমে কাজে ঝাপিয়ে পড়তেন ।কিছুদিন যাবত হয়তো বুঝে গিয়েছিলেন সময় বড় কম ! নাহলে কেন বলবেন, ‘যত পার ক্যাশ করে নাও, মরলেই কিন্তু আর পাবা না।‘ কেনইবা ৫০,৬০ কিংবা অন্য জন্মদিন পালন না করলেও ৬২তম জন্মদিন পালন করলেন ?

সপ্তাহখানেক আগের সকালে যাকে শুভেচ্ছা জানালাম , সপ্তাহ বাদে সবাইকে পাথাতে হলো তার প্র্য়াণ সংবাদের বার্তা ।বেচে থাকাটাই যে একটা ব্যতিক্রমি অভিজ্ঞতা তা মনে করিয়ে দিয়েই চলে গেলেন বাদল ভাই ।

প্রথম প্রকাশ: একপক্ষ , ১-১৫ আষাঢ় ১৪১৭,১৫ জুন ,২০১০, ১ বর্ষ । ১ সংখ্যা

যে ভাষা গর্ভের শিশু জন্ম দেয় প্রতিদিন তাকে নিয়ে যাবো দূরে, মেধার আঘাত থেকে দূরে-ইমরান ফিরদাউস-




দেখে-শুনে তো মন ভরে নাহ
মন এক পেটুক মহাশয়,হরেক পদের অফার থাকলেও তার জানি মনটা খচখচ করেই যায় ... কি কি জানি তার আরো চাই ! হুমম,‘খাই’টা কি কে কইতে পারে ! যাহোক,মনের এই “খাই খাই” দোষের কথাটা মাথায় আসলো অন্য একটা পয়েন্ট থেকে ... সেইটা হইলো সি-নে-মা । সিনেমা নানান পদের হয় তা আমরা জানি...নানান স্বাদের তো বটেই । কিন্তু ,ঐ যে কথায় আছে নাহ নিজের বাড়ির রান্নার কাছে পাঁচ তারা হোটেলের জলখাবারও নস্যি ! তো,আমার_আমাদের বাড়ি হলো বাংলাদেশে আর আমাগো নিবাস পিঙ্গল-বিহ্বল শহর ঢাকা শহরে । আমাগো বাড়িতেও রান্না হয় খাইতেও মুখরোচক কিন্তু মনডা ভরে না কেন জানি ! কেন ভরে নাহ,কেন ! 


আচ্ছা, একটা নোক্তা দেওয়ার আছিলো এই “খাওন” কিন্তু কব্জি ডুবায় খাওন না...মানে এই পৃথিবীমায় কত না সিনেমা-ফিল্ম-মুভি হইল আমার দেশেও হইল_হইতেছে কিন্তু অন্য সিনেমা দেইখা যে পুলক টা হয় ‘আপন’ সিনেমা দেইখা সেই পুলক টা চাইলেও বোধিতে আসে না কেন ! 


যদিও এই বঙ্গদেশে “১৮৯৭ ইসায়ীর ৩১ শে জানুয়ারী কলকাতার রঙ্গালয়ে, মিনার্ভা থিয়েটারে, প্রথম চলচ্চিত্র দেখানো হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর দেখানো হয় মি. সুলিভানের অ্যানিমাটোগ্রাফ। মিনার্ভার প্রতিষ্ঠা ১৮৯৩ ইসায়ীতে। মালিক ছিলেন নগেন্দ্রভূষণ মুখোপাধ্যায়। ১৮৯৬ ইসায়ীতে মিনার্ভা আর থিয়েটারে দর্শক টানতে পারছিল না। ফলে দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য প্রায়ই মাইম দেখানো হত এবং ১৮৯৫ সালের বিজ্ঞাপনে দেখতে পাচ্ছি আর্য সমাজ প্রযোজিত ছায়াচিত্রদেখবার আহবান জানানো হচ্ছে দর্শকদের। পাঠক, আমাদের তাহলে মানিকগঞ্জের হিরালাল সেন পর্যন- অপেক্ষা করতে হইতেসে না প্রথম বাঙলা সিনেমায় জন্য বা এমনকি লুমিয়ের ভাইদের জন্যও অপেক্ষা করতে হইতেসে না সিনেমা প্রযুক্তির জন্য !” [রহমান,এবাদুর:Dubshatar O Cinematantra,২০০৯, Pandulipi Karkhana,ঢাকা ।]

তবে,আমাদের সিনেমার এই বে-হাল দশা কেন ?

এই সময়ে দাঁড়িয়ে অনেক কারণ-ই বলা যায় কি কি কারণে আমাদের সিনেমা শিল্পের এহেন উলটো চলন। তবে তার চাইতে ইম্পর্টেন্ট হইলো আমাগো নাগরিক-জনতা আর সিনেমা হলে যায় না বা গেলেও সংখ্যায় স্বল্প আবার সিনেমা হলগুলিও উঠে যাচ্ছে ...এর মধ্যেও বছর দুয়েক বাদে বাদে একটা/দুইটা/তিনটা সিনেমা হইতেছে যা নিম্নচাপসম এ পরিস্থিতে খানিক শীতল বাতাসের ঝাপ্টা বইয়ে দিলেও আল্টিমেটলি নিম্নচাপ কাটায় উঠতে ব্যর্থ হইতেছে । আর,দেশাল সিনেমা উৎপাদন কারখানার কথা না বলাই ভাল বা বলাবলি করে হচ্ছে টা কি !

তো,এইরকম চেহারা ধারণের পেছেন নিমিত্ত কি ! 


আমাদের ইমেজ কারিগর গো হাতে কি জাদু নাই বা তারা কি ফিল্মের ভাষায় কথা কইতে পারে না নাকি আমাগোর রাষ্ট্র ফিল্মমেকারদের সহায় নয়...বা আমাগো তরুণ জেনারেশন ফিল্ম-বিমুখ !

আমাগো রাষ্ট্র ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন ঘটাইতে যথেষ্ট আন্তরিক না-এইটা ভয়াবহ সত্য । আর বাকি যে সিম্পটম গুলির কথা তোলা হইছে তার সবই হাজির-নজির আছে আমাগো চারপাশে । 


কিন্তু, ভাই-বেরাদর-বোন সকল জানবেন এইখান থেকেই আরেক সংকটের সূচনা ...


এইযে তরুণ তুর্কীরা আছে যাগো প্রায় সক্কলের দিবা-নিশিযাপন ফিল্ম আক্রান্ত , কেউ কেউ তো কইতে গেলে ফিল্ম খায়,পান করে,মৈথুন-ও করে ... তাগো কি সিস্টেম নিজেরে জাহের করার

জাফর পানাহির শেষ খোলা চিঠি,প্রথম নির্বাসনের আগে বা একটি স্বপ্নের তরে শোকগাথা-ইমরান ফিরদাউস




০.০
“ চলচ্চিত্র-নির্মাতার ভুবন বাস্তবতা ও স্বপ্নের মধ্যকার অন্যোন্যক্রিয়ার রেখা দ্বারা সীমায়িত একজন চলচ্চিত্র-নির্মাতা তার জগত-বাস্তবতাকে অনুপ্রেরণা রূপে ব্যবহার করে,কল্পনার রঙ দিয়ে সেই ছবি তথা সিনেমাটাই আঁকে যা তার আশা ও খোয়াবের সারথি হয়ে দর্শকের মনের আকাশে কুসুম হয়ে ভেসে ভেসে উড়ে বেড়ায়।

বিগত পাঁচ বৎসর যাবত যে জীবন-রাজনৈতিক বাস্তবতা আমার সিনেমার খোরাক ছিল,যা নজর করে আমি সিনেমা করতাম তা এখন আগামী কুড়ি বছরের জন্য আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্বের কোপে পড়ে সশরীরে নির্বাসিত । শুধু কি তাই ! চিন্তা প্রকাশের অধিকার থেকেও আমাকে বিরহিত করা হয়েছে ।
কিন্তু স্পষ্ট জানি যে, কল্পনার কারখানায়  আমার স্বপ্নগুলি প্রতিনিয়ত সিনেমা উৎপাদন করে যাবে...কারা-নির্বাসন আমায় একজন সমাজ সচেতন নির্মাতা হিসাবে আমজনতার দৈনন্দিন জীবন ও নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যাগুলির জীবন্ত বর্ণনা দান বা সেরূপ প্রতিকৃতি সেলুলয়েডে গাঁথার ফুরসত দিবে না তদপুরি আগামী বিশ বছরে এহেন সমস্যাবলী সমগ্র পৃথিবী থেকে উধাও হবে এবং পুনর্বার সুযোগ পাওয়া মাত্র সে যাত্রায় ইরানের মাটিতে শান্তি ও সমৃদ্ধির সিনেমা করব সেই স্বপন দেখা থেকে আত্মাকে নিরস্ত করতে আমি অপারগ !

হকিকত হইলো তারা [ইরানের সরকার] কুড়ি বছরের জন্য আমাকে চিন্তা ও লেখা করা সর্বোপরি সংজ্ঞাপনের মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত করবে কিন্তু আগামী দু’দশকে এই সংবীক্ষণ ও ভীতিপ্রদর্শনের অবদমনমূলক রাষ্ট্রনীতি/রাজনীতি বাক স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হবে_সেই স্বপ্ন লালন করা থেকে তারা আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবে নাহ ।

তাদের কারণে আসছে বিশ বছর পৃথিবীর জল,হাওয়া আমি ছুঁতে পারবো না,ছুটে বেড়াতে পারবোনা পাখির কাছে বা ফুলের দেশে,কবিতার দেশেআশা রাখি নির্বাসন উত্তরকালে আমি ভৌগলিক,নৃতাত্ত্বিক,আদর্শগত কাঁটাতারের বেড়া না মাড়িয়ে তামাম দুনিয়া চষে বেড়াতে পারবো, ভ্রমণ করতে পারবো সেই পৃথিবীতে যেখানে মানুষ পরস্পরের বিশ্বাস ও প্রত্যয় নিয়ে অহেতুক মাথা না ঘামিয়ে মুক্তমনে আস্থার সাথে পাশাপাশি বসবাস করে

ওদের বিচারে সাব্যস্ত দোষী আমাকে কাটাতে হবে শব্দহীনতার বিশ বছর । এবং তা সত্ত্বেও আমার সমস্ত সত্ত্বা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাবে এমন একখানা কালের তরে যে কালে  আমি,আমি_আমরা সকলে মত সহিষ্ণু হতে জানবো,অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে থাকবো এবং একে অপরের নিমিত্তে বাঁচবো ।

আমার অপরাধের সালিশে জুরিবৃন্দ ছয় বছরের জেল সাজা নির্ণয় করেছেন , তাতে কি ! আগামী অর্ধ যুগ তবুও এই মনচাষা _স্বপ্ন এ ক দি ন সত্যি হবে এই বিশ্বাসে আকাঙ্ক্ষার জমিনে আশা-র চারা বুনে যাবে । আশা রাখি, মেদিনীর আনাচে-কানাচে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা আমার সহযোদ্ধা সিনেমা-সাথীরা এমন সব তাক লাগানো ,ভ্রম জাগানিয়া উড়াধুরা সিনেমা করবেন যা দেখে-শুনে কারামুক্তির পর নব পারমিতায় ইমেজ কারিগরের পুরনো পেশায় নতুন করে ফেরত যেতে এই বান্দা দ্বিধা করবে না

এইতো...এ মূহুর্ত থেকে আগামী বিশ বছর জন্য আমার জবান তাদের রিমান্ডে বন্দি হলো !! আমি দৃষ্টির স্বাধীনতায় তারা ঠুলি পরিয়ে দিলো, আমার ভাবনা-চিন্তার গলায় দড়ি দিয়ে জানানো হল স্পিকটি নট্‌ ! আমার সিনেমা করার শৈলীগত অধিকার তারা রাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে গেলো ...

জানবেন...বাস্তবতা আমাকে বন্দীদশা ও বন্দী কর্তার অধীন করলেও আমি জেগে থাকবো আপনাদের সিনেমায় .. আমার স্বপ্নের প্রকাশ দেখার জন্য ,আশা করি তা খুঁজেও পাবো যা থেকে আমি বঞ্চিত রইবো সামনের দিনগুলিতে

১.০
২০১০ সনের ২০ ডিসেম্বর ইরানের বিপ্লবী সরকার কর্তৃক আরোপিত ছয় বছরের জেল সাজাসহ কুড়ি বছরের নির্বাসন জীবন শুরুর প্রাক্কালে এটাই ছিল জাফর পানাহির শেষ খোলা চিঠি । ২০১১ সনের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের একষট্টি তম সংস্করণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে চিঠিটি পাঠ করা হয় । পানাহির মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের অর্গল আঁটানোর সংবাদে সিনেমা জাহানের তাবৎ প্রাণী ৪৪০ ভোল্টের শক খায় যেন ! প্রকাশ থাকুক, এ বছরকার বার্লিন উৎসবের সংস্করণে পানাহি অন্যতম আন্তর্জাতিক জুরি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন৪৪০ ভোল্টের শকড্‌ টা কাটায় উঠা মাত্রই অবনীর পরে নিন্দা-প্রতিবাদের রোল পড়ে যায়; কিন্তু,হায় কুম্ভকর্ণের ঘুম কে ভাঙ্গাতে জানে !! মূহুর্মূহ প্রতিবাদ,বিক্ষোভের একবর্ণও আহমেদিনিজাদ সরকারের কর্ণকুহরে প্রবেশিল না । তারা বরং দেশের নিরাপত্তা বিধানের অজুহাতে ঈমানী জোশে হাজতি পানাহির উপর একহাত ঝেড়ে নিলো ... কি বলবেন বলুন ! কিছু বলার আছে ?!?

২.০
পানাহির সাথে প্রথম পরিচয় ২০০৫ সালের কিছু আগে পরে তাঁর তালায়ি সোর্খ বা ক্রীমসন গোল্ড (২০০৩) ছবিটার মধ্যে দিয়া এবং বলাই বাহুল্য তা ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সংসদের আয়োজনে । তো,এর আগেই ইরানি সিনেমা নিয়ে একপ্রকার বোঝাপড়া ছিল মনে মনে...বিটিভি তে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বিভিন্ন সময় প্রচারিত কখনো পুরোটা আবার কখনো আধটা ইরানি সিনেমা দেখে দেখে । কিন্তু, ক্রীমসন গোল্ড এর আলাপের সুরটা যেন একটু অপরিচিত-ই ঠেকলো। বোকাবাক্স আমারে যে ইরানি ছবি দেখতে শেখায়ছিলো পানাহির ছবি ঐ তুলনায় অধিক জীবন্ত ! ইরানি সিনেমায় যে এইরকম আধান [চার্জ] আছে এই নাদান সিনেমাহলিক পয়লাবার টের পাইলো ...এরপর শুরু হইলো তালিকা দীর্ঘ হবার পালা, কালে কালে চিনতে শিখলাম আব্বাস কিয়োরোস্তামি,মহসিন মাখমলবাফ,সামিরা মাখমলবাফ,রসুল সাদ্মানি সহ আরো অনেক কে, পরিষ্কার করে বললে ‘ইরানি নিউ ওয়েভ ফিল্ম’এর সহিত বোঝাপড়া,সখ্যতার সূচনা ঘটলো ।

৩.০
পূর্ব আজারবাইজানের মায়েনাহ শহরে ১৯৬০ সনের ১১ জুলাই জন্ম হয় ইরানি নিউ ওয়েভ ফিল্ম মুভমেন্টের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা জাফর পানাহির । যে বয়সে মানুষের খেলার সঙ্গী হয় যেকোন খেলনাপাতি  সেই বয়সে পানাহি পরিচিত হতে শুরু করে ৮ মি.মি. ক্যামেরার সাথে...ছবি বানানোই ছিল তাঁর খেলা ; কখনো নিজে করছেন আবার কখনোবা অন্যের জন্য পারফর্মার হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলেন । ক্যামেরার আগু-পিছু করতে করতে বেড়ে উঠা পানাহি তারুণ্যে ঝুঁকলেন ফটোগ্রাফির প্রতি ।

১৯৮০’র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বাঁধলে বাধ্যতামূলকভাবে তাকেও মিলিটিরি সার্ভিসে যোগদান করতে হয়। জানেন তো, পানাহি কিন্তু ময়দানে দুটো রাইফেল বগলদাবা করে ঘুরে বেড়াতো ! যুদ্ধের ময়দানে তাঁর সাথে সাথে  ৮ মি.মি. ক্যামেরাটাও যে হাজির হয়েছিল ! আর ক্যামেরা যখন রাইফেল এ টার্ন নেয় তখন 2D ক্যামেরাও যে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে তা কি আমরা জানি না ! ফলাফল Yarali Bashlar (The Wounded Heads, 1988) টাইটেলের প্রামাণ্যচিত্র ।
সার্ভিস ফেরতা পানাহি তেহরানের কলেজ অব সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন-এ পাঠ চুকিয়ে ইরানিয়ান টেলিভিশনের জন্য বেশ কিছু ফিল্ম বানালেন এর মাঝে ১৯৯৪ সনে আব্বাস কিয়োরোস্তামির সাথে সহকারী পরিচালক হিসাবে Through the Olive Trees (1994) নির্মাণ করেন । এরপর পানাহিকে আর থামতে হয়নি... Badkonake Sefid (The White Balloon, 1995) এর মাধ্যমে পানাহি নিজের জাতটা চিনিয়ে দেন বিশ্ববাসীকে জয় করেন কান চলচ্চিত্র উৎসবের ক্যামেরা ডি’অর । 

এরপর The Mirror (Ayneh, 1997)-র জন্য লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের গোল্ডেন লিওপার্ড, The Circle (2000)-র জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের গোল্ডেন লায়ন, Crimson Gold (2003)-র জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি পুরস্কার এবং সর্বশেষ Offside (2006) পায় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের সিলভার বিয়ার পদক ।

৪.০
আসেন পাঠক-পাঠিকাবৃন্দ আমরা আবার ফেরত যাই পানাহির গ্রেফতার নাটকে ।
পানাহি প্রথমবার রাষ্ট্রের কারাগার নামক অতিথিশালায় কোন মামলা বা অভিযোগ ব্যতিরেকে আপ্যায়িত হন ২০০৯ সনের ৩০ জুলাই যখন তিনি সপরিবারে তেহরানের গোরস্তানে গ্রিন পার্টির সমর্থক সঙ্গীতঙ্গ নেদা আগা সুলতানের সমাধিতে আত্মার মাগফেরাত রত ছিলেন; দিন কতক বাদে বহাল তবিয়তে তাকে খালাস করা হয় তবে পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে দেশত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় । এমনকি ষাটতম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের নির্ধারিত বিষয়ে প্যানেল আলোচনায় যোগ দেয়ার আবেদন সরকার খারিজ করে দেয় ।

১ মার্চ ২০১০ সনে সাদা পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে পানাহির বাসস্থান থেকে স্ত্রী,কন্যা এবং উপস্থিত পনর জন বন্ধু সহ সবাইকে গ্রেফতার করে হাজতে চালান করে দেয় । ৪৮ ঘণ্টা পর মোহাম্মদ রসূলুফ , মেহেদী পোরমুসু এবং জাফর পানাহি ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয় । রসূলুফ এবং মেহেদী ১৭ মার্চ ছাড়া পেলেও পানাহি কে এভিন কারাগারের ২০৯ ওয়ার্ডে আটকে রাখা হয় । পানাহির গ্রেফতারের বিষয়টি সরকার গণমাধ্যমে স্বীকার করলেও স্পষ্ট কোন অভিযোগ দেখাতে ব্যর্থ হয় ১৪ এপ্রিল ২০১০ সনে ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রী জানান যে পানাহি কে গ্রেফতার করা হয়েছে কারণ “তিনি শাসন ব্যবস্থা বিরোধী প্রোপাগান্ডামূলক ছবি তৈরি করছিলেন যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক গভীর চক্রান্ত ।”

মাননীয় মন্ত্রীর বক্তব্য যে সর্বৈব মিথ্যা তা পরিষ্কার বোঝা যায় পানাহির বিবি তাহিরাহ সাঈদীর বক্তব্য থেকে, তিনি মধ্য মার্চে বার্তা সংস্থা এএফপি[AFP]-র এক প্রশ্নের জবাবে বলেন “পানাহির নির্মিয়মান ছবিটার কেন্দ্রে ছিল নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতি বা চাল-চিত্র এবং ছবিটি নির্মিত হচ্ছিলো বাসার ভিতরে ... তাহলে এখন কিভাবে পানাহি বা তাঁর ছবি রাষ্ট্রে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করলো !?!
” 
কারাগারে অপদস্থ করা এবং তাঁর পরিবারকে হুমকি-ধামকি দেওয়ার প্রতিবাদে পানাহি ১৮ মে ২০১০ থেকে আমরণ অনশন শুরু করলে টানা পাঁচ দিনের  মাথায় ২০,০০০ মার্কিন ডলার জামানতের প্রেক্ষিতে তাকে জামিন দেয়া হয়

১২ নভেম্বর ২০১০এ কোর্টে দেয়া তাঁর দীর্ঘ আত্ম পক্ষসমর্থনমূলক বক্তব্যের শেষ বাক্যটি ছিল “আমি একজন ইরানি নাগরিক এবং ইরান-ই আমার শেষ ঠিকানা ।”

প্রায় ত্রিশ দিনের প্রসিকিউশন শেষে রাষ্ট্র পক্ষের মামলার প্রেক্ষিতে আদালত রায় ঘোষণা করে ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো ও শান্তি বিনষ্টকর কর্মে ইন্ধন যোগানো এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ বিশ বছরের জন্য সিনেমা পরিচালনা,চিত্রনাট্য রচনা এবং ইরানি বা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেকোনো প্রকার সাক্ষাৎকার প্রদান ও দেশত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল । ’
হাহ্‌...এই না হলো একবিংশ শতকের প্রজ্ঞা ! একেই কি বলে সভ্যতা ! এই ক্ষণে কবি রণজিৎ দাশের লাইনটা মনে পড়ে গেল~ ‘স্বমেহনে প্রশমিত যে উত্তেজনা- তা-ই সভ্যতা ।’

৫.০
জাফর পানাহি কে এহেন ‘খ্যাতির বিড়ম্বনার’ শিকার কেন হতে হলো ?
উত্তর- সিনেমা !

পানাহি ইরানি নিউওয়েভ ফিল্ম আন্দোলনের অন্যতম নির্ভীক নির্মাতা,রাগীও বটে । তাঁর রাগ কিন্তু সরাসরি ফ্রেমে ফ্রেমে আছড়ে পড়ে নাহ । বরং এক বরফ শীতল স্নায়ুচাপের উদ্রেক করে । যেমন ধরা যাক, তাঁর ক্রীমসন গোল্ড (২০০৩)-এর মূহুর্তগুলি যেখানে একজন  ইরান-ইরাক যুদ্ধ ফেরত সৈনিক সাধারণ জীবনে পিৎজা ডেলিভারি ম্যান, স্বর্ণের দোকান লুট করতে গিয়ে ঘটনা পরম্পরায় প্রথমে দোকানদারকে গুলি করে ... পরের বুলেটে নিজের নামটা খোদাই করে নেয় ! তাত্ত্বিকভাবে নব্য-বাস্তববাদী ঘরানার মাস্টারপিস এই ছবি তত্ত্বের বাইরে আমার চেতনায় বাঙালি আবেগ ও জার্মান ক্রোধের এক মিশ্র অনুভূতির উন্মেষ ঘটায় ।

পানাহি প্রতিটা কাজে সমসাময়িক অন্যান্য নির্মাতার তুলনায় নির্ভীকভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বিপ্লবী সরকারের শ্যেন নজর উপেক্ষা করে খন্ডিত মূহুর্তমালার ভিতর দিয়ে বর্তমান ইরানের রূঢ় সামাজিক বাস্তবতা ও প্রকট শ্রেণী ব্যবধান তুলে ধরে থাকেন ।

দ্য সার্কেল (দায়িরেহ,২০০০)-এ তিনি অস্বাভাবিক স্পর্শকাতরতার সাথে বিদ্যমান সমাজে নারী নিপীড়নের বাস্তবতা ফ্রেমবন্দী করেছেন । সার্কেলের একটি দৃশ্যের কথা বলা যায় যেখানে ফ্রি-মিক্সিং পার্টিতে[নারী-পুরুষ উভয়ের অবস্থান অর্থে] জানালার বাইরে থেকে সিল্যুটেড নারী অবয়ব দেখা যার নাচছে-নিজেদের মত করে আনন্দ করছে । এই নারীকেই কিন্তু বাকি সময় দেখা যায় মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়ে চলতে,স্ফূর্তিহীন বিষণ্নতায় আক্রান্ত চেহারা বয়ে বেড়াতে।

দ্য সার্কেল তুলে ধরে নারী-পুরুষের পারাস্পারিক সামাজিক সম্পর্কের উপর রাষ্ট্রের অনাহূত হস্তক্ষেপের সেই ইমেজাবলী যার কোন অংশ-ই বানোয়াট নয় পুরোটাই নিয়মিত বাস্তবতা ইরানের সমাজে যেখানে নারী ধর্মের দোহাই দিয়ে নিরাপত্তার অজুহাতে অদ্ভুত বেড়াজালে আটকা  তারপরও, মানবীয় আকাঙ্ক্ষার তাড়নায় শত বাধা ও ঝুঁকি সত্ত্বেও তারা মেতে উঠে উৎসবে । এভাবেই পানাহি বিপ্লবি সরকারের কূপমুন্ডকতার বলিহারি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন

আরও বলা যেতে পারে বহুল আলোচিত অফসাইড (২০০৬) ছবিটির কথা । যেখানে একদল ফুটবলপ্রেমী তরুণীর জাতীয় দলকে সমর্থন জানানোর জন্য এবং ফুটবল উপভোগ করার জন্য স্টেডিয়ামে প্রবেশের ফন্দি-ফিকির করে। যাহোক, এই সিনেমার মূলে আবারো লিঙ্গের প্রশ্নটি পানাহি উপস্থাপন করেন নতুনভাবে ।

নতুন এই অর্থে যে ,আমরা সাধারণত যা ভেবে থাকি যেমন (শুধু) ‘নারীরাই তাদের অধিকার এর প্রশ্নে সোচ্চার’ বা ‘মিলিটারি মাত্রই এলিয়েন’ এই ধারণাগুলির খোলনলচে-তে তিনি বেশ জোরেই একটা বাড়ি মারেন । কারণ , ইরানে শুধু নারীরাই নয় পুরুষরাও নিপীড়নের স্বীকার তাই ,নারীমুক্তির প্রশ্নে তারাও সমান সহানুভূতিশীল সেদিকটি সংলাপের মধ্যে দিয়ে দর্শকের নজরে আনেন তিনি । আর মিলিটারি পোষাকের যে তরুণকে দেখা যায় তা কোনভাবেই তার আকাঙ্খিত পোষাক নয়...এইটা বাধ্যতামুলক যে ১৮+ বয়সের  সবাইকে আর্মিতে নাম লেখাতেই হবে ! সেই অর্থে গায়ে উর্দি জড়ালেও মননে সে আর দশজন তরুণের মতই প্রগতিশীল বা আধুনিক এই চরিত্র নির্মাণের ভেতর দিয়ে মানবিক দিকটি প্রকাশ করেন ...

পানাহি অফসাইড (২০০৬)-এ খানিকটা সিনেমাভেরিতে শৈলীতে অর্থাৎ ডকুমেন্টারি আঙ্গিকে কাহিনীচিত্রের আনুষাঙ্গিক জুড়ে দিয়ে বিচিত্র এক টেনশনের পরিচলন ঘটিয়েছেন পুরা সিনেমা জুড়ে । এবং অবধারিতভাবে প্রচলিত [আরোপিত] সমাজ ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন ।
এইদিক থেকে পানাহি তাঁর সহকর্মী বাস্তববাদী নির্মাতা আব্বাস কিয়োরস্তামির চাইতে পরিপূর্ণভাবে সামাজিক অধিবিচারে আগ্রহী ,একরোখাও বটে
৬.০
তাহলে, পাঠক [দর্শক] এইটা বলা যায় যে, জাফর পানাহির সিনেমাকে রাজনৈতিক সিনেমা বলার উপায় নাই বরং আমল করা যেতে পারে একটা শার্সি বা আয়নার মত ; কারণ তার সিনেমার মানুষগুলি কেউ কিন্তু কখনো রাজনীতিকদের মত বলে না “এটা করো বা ওটা করো নাহ !” বরং, পানাহি তার সিনেমায় মানুষের ক্লেশলাঘব স্বাভাবিক ঘটনা প্রবাহের ভাষ্য কাব্যিক ও শৈল্পিক লক্ষণায় রূপায়ণ করেন মাত্র এবং এর মধ্যদিয়ে সমাজের বর্তমান হালের প্রতিবিম্ব শাসকগোষ্ঠির নজরে আনতে চান

হ্যাঁ,এইখানেই যত গোস্বা সরকাররাজের !!

কেন,পানাহি মিষ্টি মিষ্টি ছবি না তুলে,ইলিশ ইলিশ স্মৃতির বয়ান না করে এইসব ফোটো উঠায় ! এইটা কিছু হইলো ? পানাহির উপর আলবৎ শয়তান নাযেল হইছে আর এই শয়তান পানাহির ভেক ধরে দেশের শান্তি নাশ কইরা ফেলবে...পানাহিকে আরেকবার ইরানি হবার সুযোগ করে দেয়াটা রাষ্ট্রের কর্তব্য ।।

আর,তাই পানাহি জেলে আর আপন সন্তানের মতিভ্রম রোধ করতে পেরে সরকাররাজের দিলখোশ!

৭.০
জাফর পানাহিদের মত নির্মাতাদের মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠা এই স্বাধীন ধারার, সমালোচনাবাদী ভিন্নমতাশ্রয়ী নির্মাতাগণ রাষ্ট্রের মিথ্যাভাষণ ও বিচারবুদ্ধিহীন/অযৌক্তিক ক্রিয়াকর্মের বিরুদ্ধে সন্তর্পণে অন্যস্বরের যে আওয়াজ তুলেছেন তা সহসাই নিস্তব্ধ হওয়ার নয় । জানি,পানাহির [নতুন] ছবি আমরা আগামী বিশ বছর দেখতো পাবো না ; এতে হয়তো শাসককূল আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারেন কিন্তু আমরাও জানি কী উপায়ে আগামী কল্য চলে যেতে হয় গত কল্যের দেশে !! সেই দেশে পানাহির সাথে পুনরায় যে মোলাকাত হবে তা বিলক্ষণ জানি । কেননা,আশ্চর্য পথে কোথাও দেখার মত আজো যে কিছু রয়ে গেছে ...


সংযুক্তিঃ
পানাহির খোলা চিঠির লিঙ্ক http://www.berlinale.de/en/das_festival/festivalprofil/berlinale_themen/openletterpanahi.html
২৬-২৯ এপ্রিল ২০১১, মাকাসার,ইন্দোনেশিয়া।

বৃহষ্পতিবার, ১৫ মার্চ, ২০১২

ভার্টিগো বা হিচককের স্বপন আমার মাথার ভিতর ঘুরপাক খায় - ইমরান ফিরদাউস



হিচককের দর্শকপ্রিয় সিনেমার তালিকায় ঘুরেফিরে গোটা পাঁচেক সিনেমার নাম ঠোঁটের আগায় আসলেও ১৯৫৮ সনে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভার্টিগো’-র নাম সচরাচর আসে না। যদিও এটিকে হিচকক মশাইয়ের অন্যতম সেরা কাজ হিসাবে ধরা হয় এবং সিনেমাবেত্তা ও সমালোচকবৃন্দ বলে থাকেন যে এইখানে ‘অরিজিনাল’ হিচকক কে সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়।

মুক্তির পরপরই এটি দর্শক-সমালোচকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়। তবে ১৯৯৬ সনে ৭০ মি.মি.-এ পুনরায় মুক্তি দেয়া হলে তা নতুন প্রজন্মের হিচকক প্রেমীদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। ‘ভার্টিগো’কে এখন হিচককের সেরা শিল্পকর্ম রূপে মূল্যায়ন করা হয়। ‘ভার্টিগো’ আমাদের দেখায়-শোনায় মন বা বোধের আচ্ছন্ন দশার এবং হারানো ভালবাসার আশাহীন সন্ধানের এক স্বাপ্নিক উপকথা। একে টানটান থ্রিলার না বলে বলা যায় ধৈর্য-স্থৈর্যের যোগব্যায়ামের রোজনামচা যেথায় নির্মাতা চটুল ভঙ্গীতে জটিল বিন্যাসের তরল গল্প বলেছেন।

‘ভার্টিগো’ ফরাসি লেখক পিয়েরে ব্যুলে ও থমাস নারসেজাকের বই d'Entre les Morts অবলম্বনে রচিত। লেখকদ্বয় বইটি মূলত হিচককের জন্যই লিখেছিলেন;কেননা,হিচকক এর আগে তাদের সেরা কাজ Les Diaboliques নিয়ে সিনেমা করার স্বত্ব অর্জনের লড়াইয়ে ছিটকে পড়েছিলেন। বই থেকে অ্যালেক কপেল ও স্যামুয়েল এ. টেইলর দারুণ,সুগঠিত,সৃষ্টিশীল চিত্রনাট্য রচনা করেন। সিনেমার চিত্রায়ণ করা হয় সানফ্রান্সিস্কো ও এর আশেপাশের এলাকায়,যেথায় সর্বদা বিরাজ করে এক অদ্ভুত জীবন-চাঞ্চল্যহীন শূন্যতা।

‘ভার্টিগো’-র কাহিনী জিম স্টুয়ার্ট অভিনীত অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার জন স্কটি ফার্গুসন,কিম নোভাক রূপায়িত ধনাঢ্য,সুন্দরী মেডেলিনকে ঘিরে বিস্তার ঘটেছে। জন স্কটি ফার্গুসন একজন অবসরপ্রাপ্ত সান ফ্রান্সিসকো পুলিশ গোয়েন্দা যিনি উচ্চতা-ভীতিতে​​ভুগছেন এবং স্বর্ণকেশী,বরফ শীতল মেজাজের মেডেলিন হল ধনাঢ্য,সুন্দরী ভদ্রমহিলা যে কিনা স্কটিকে ​​উচ্চ স্থানে নিয়ে যায়। গ্যাভিন এলস্টার (টম হেল্মোর) ধনী জাহাজ নির্মাতা যিনি কলেজ দিন থেকে স্কটিকে চেনে,তার দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে জানে এবং স্কটিকে অনুরোধ করে তার সুন্দর স্ত্রী, মেডেলিন অনুসরণ বা পাহারা দিতে একজন প্রাইভেট গোয়েন্দা হিসেবে। এলস্টারের ভয় সে উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে, হয়ত এমনও হতে পারে আত্মঘাতী হওয়ার অভিপ্রায় রাখে, কারণ ম্যাডেলিন বিশ্বাস করে যে সে শত বছর আগে তার মৃত দাদীর দাদীর আত্মা দ্বারা অধিকৃত। সংশয়ী স্কটি কাজটি নিতে প্রথমে দোনোমনো করলেও, রূপসী মেডেলিনের রূপের কাছে গ্রেফতার হয় তার চোখ জোড়া। প্রথম দেখাতেই স্কটির কপালে মেডেলিনের মুখ যেন বুলেটের মত বিধে যায়। রূপ মোহাচ্ছন্ন স্কটি ভুলে যায় তার দায়-দায়িত্বের কথা। মেডেলিনকে পাবার তরে তার জেগে উঠে উদগ্র কামবাসনা আর তা দমনের উপকরণ হয় ভোয়ারিজম। ঘটনাচক্রে সে মেডেলিনকে পায় না তবে পায় জুডি (কিম নোভাক) কে এবং জুডিকে ভেঙ্গে-চুরে,চুরে-ভেঙ্গে সে বের করে আনতে চায় তার স্বপ্নের রাণী ম্যাডেলিন কে। তবে বিপদের কথা হলো,জুডি-ই হলো ম্যাডেলিন,ম্যাডেলিনের আত্মহত্যা প্রকল্প সকলই একটি খুনের গল্পের অংশ এবং স্কটি সেথায় শুধু কুশীলব মাত্র! তার স্বপ্ন নিয়ে এহেন ছিনিমিনি খেলার নীল-নকশা উপলব্ধি করা মাত্র সে ক্রুব্ধ তর্জন-গর্জনে ফেটে পড়ে। শেষমেষ আমরা জুডিকেও মারা যেতে দেখি। এ্যান্টি হিরোর চরিত্রে স্কটি নামে জিম স্টুয়ার্ট তার জীবনের সেরা কাজ উপহার দিয়েছেন। আর কিম নোভাকের রূপমাধুর্যময় অভিনয়ের কথা তো আমরা এতক্ষণে জেনে গেছি।

অমায়িক সিনেমাটগ্রাফির দোহাইয়ে ‘ভার্টিগো’ তার কাহিনীর উৎরিয়ে উপস্থিত হয় চলমান পেইন্টিংসে যার ফাকে ফাকে গুঁজে দেয়া আছে চেতনায় ঝাকি দেয়া কিছু দৃশ্য,যা আসলে সিনেমার রোমান্টিক থীমকে মূর্ত করে তোলে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় গোল্ডেন গেট ব্রীজে স্কটি-ম্যাডেলিনের পরস্পরের তাকিয়ে থাকার দৃশ্য, সমুদ্র তীরে চুম্বনের দৃশ্য,বেল টাওয়ারের ভীতিকর দৃশ্য ইত্যাদি। এও প্রকাশ থাকুক যে,হিচকক সেইকালে এই ছবিতে ব্যাক স্ক্রীন প্রজেকশনের উদ্ভাবনী ব্যবহার এবং যুগপৎভাবে ক্যামেরা জুমিং ও ট্র্যাকিং আউটের কৌশল সাসপেন্সের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়;দর্শকে টেনে আনে ঘটনার ঘনঘটার শিকড়ে,ঘটনার তখন পর্দা ছেড়ে দৌড়াদৌড়ি করে মস্তিষ্কে,স্নায়ুতে স্নায়ুতে।

শৈলীগত দিক থেকে, সিনেমার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো লাল ও সবুজ বর্ণ কেন্দ্রিক সুনিয়মিত বিন্যাস এবং বার্নার্ড হেরম্যানের চমত্কার,বুদ্ধিদীপ্ত,আবেগ তাড়িত সুরযোজনা সিনেমার মেজাজের রাশ নিখুঁতভাবে ধরে রেখেছে যেমন স্কটির মেডেলিনকে অনুসরণ করার সংলাপবিহীন দৃশ্যগুলিতে সুরের দোলাচল হিচককিয় আবেশকে বরং আরো পোক্ত করে তোলে।

নৈপুণ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে-এই ছায়াছবি হিচককের উৎকর্ষতার শীর্ষবিন্দুকে প্রতিনিধিত্ব করে। সমালোচনার নাম করে ‘ভার্টিগো’-র ভঙ্গুর আখ্যানের ছলনায় কতিপয় দৃশ্যের নিকটে গেলে আমাদের চোখ থেকে প্রকৃত সমালোচনা উড়ে যায় আর আমরা মুগ্ধ নয়নে নতুন করে দেখতে শুরু করি আবার,বার বার...একেই বোধহয় বলে ভার্টিগো বা ঘূর্ণিরোগ !