০.০
“ চলচ্চিত্র-নির্মাতার ভুবন বাস্তবতা ও স্বপ্নের
মধ্যকার অন্যোন্যক্রিয়ার রেখা দ্বারা সীমায়িত । একজন
চলচ্চিত্র-নির্মাতা তার জগত-বাস্তবতাকে অনুপ্রেরণা রূপে ব্যবহার করে,কল্পনার
রঙ দিয়ে সেই ছবি তথা সিনেমাটাই আঁকে যা তার আশা ও খোয়াবের সারথি হয়ে দর্শকের মনের
আকাশে কুসুম হয়ে ভেসে ভেসে উড়ে বেড়ায়।
বিগত পাঁচ বৎসর যাবত যে জীবন-রাজনৈতিক বাস্তবতা
আমার সিনেমার খোরাক ছিল,যা নজর করে আমি সিনেমা করতাম তা এখন আগামী কুড়ি বছরের জন্য
আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্বের কোপে পড়ে সশরীরে নির্বাসিত । শুধু কি তাই ! চিন্তা প্রকাশের
অধিকার থেকেও আমাকে বিরহিত করা হয়েছে ।
কিন্তু স্পষ্ট জানি যে, কল্পনার কারখানায় আমার স্বপ্নগুলি প্রতিনিয়ত সিনেমা উৎপাদন করে
যাবে...কারা-নির্বাসন আমায় একজন সমাজ সচেতন নির্মাতা হিসাবে আমজনতার দৈনন্দিন জীবন
ও নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যাগুলির জীবন্ত বর্ণনা দান বা সেরূপ প্রতিকৃতি সেলুলয়েডে
গাঁথার ফুরসত দিবে না তদপুরি আগামী বিশ বছরে এহেন সমস্যাবলী সমগ্র পৃথিবী থেকে
উধাও হবে এবং পুনর্বার সুযোগ পাওয়া মাত্র সে যাত্রায় ইরানের মাটিতে শান্তি ও সমৃদ্ধির সিনেমা করব সেই স্বপন দেখা
থেকে আত্মাকে নিরস্ত করতে আমি অপারগ !
হকিকত হইলো তারা [ইরানের সরকার] কুড়ি বছরের জন্য আমাকে
চিন্তা ও লেখা করা সর্বোপরি সংজ্ঞাপনের মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত করবে কিন্তু আগামী
দু’দশকে এই সংবীক্ষণ ও ভীতিপ্রদর্শনের অবদমনমূলক রাষ্ট্রনীতি/রাজনীতি বাক
স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হবে_সেই স্বপ্ন লালন করা থেকে তারা
আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবে নাহ ।
তাদের কারণে আসছে বিশ বছর পৃথিবীর জল,হাওয়া আমি
ছুঁতে পারবো না,ছুটে বেড়াতে পারবোনা পাখির কাছে বা ফুলের দেশে,কবিতার দেশে । আশা রাখি নির্বাসন
উত্তরকালে আমি ভৌগলিক,নৃতাত্ত্বিক,আদর্শগত কাঁটাতারের বেড়া না মাড়িয়ে তামাম
দুনিয়া চষে বেড়াতে পারবো, ভ্রমণ করতে পারবো সেই পৃথিবীতে যেখানে মানুষ পরস্পরের
বিশ্বাস ও প্রত্যয় নিয়ে অহেতুক মাথা না ঘামিয়ে মুক্তমনে আস্থার সাথে পাশাপাশি
বসবাস করে ।
ওদের বিচারে সাব্যস্ত দোষী আমাকে কাটাতে হবে
শব্দহীনতার বিশ বছর । এবং তা সত্ত্বেও আমার সমস্ত সত্ত্বা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে
যাবে এমন একখানা কালের তরে যে কালে
আমি,আমি_আমরা সকলে মত সহিষ্ণু হতে জানবো,অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ
করে থাকবো এবং একে অপরের নিমিত্তে বাঁচবো ।
আমার অপরাধের সালিশে জুরিবৃন্দ ছয় বছরের জেল সাজা
নির্ণয় করেছেন , তাতে কি ! আগামী অর্ধ যুগ তবুও এই মনচাষা _স্বপ্ন এ ক
দি ন সত্যি হবে এই বিশ্বাসে আকাঙ্ক্ষার জমিনে আশা-র চারা বুনে যাবে । আশা
রাখি, মেদিনীর আনাচে-কানাচে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা আমার সহযোদ্ধা সিনেমা-সাথীরা এমন
সব তাক লাগানো ,ভ্রম জাগানিয়া উড়াধুরা সিনেমা করবেন যা দেখে-শুনে কারামুক্তির পর নব
পারমিতায় ইমেজ কারিগরের পুরনো পেশায় নতুন করে ফেরত যেতে এই বান্দা দ্বিধা করবে না ।
এইতো...এ মূহুর্ত থেকে আগামী বিশ বছর জন্য আমার
জবান তাদের রিমান্ডে বন্দি হলো !! আমি দৃষ্টির স্বাধীনতায় তারা ঠুলি পরিয়ে দিলো,
আমার ভাবনা-চিন্তার গলায় দড়ি দিয়ে জানানো হল স্পিকটি নট্ ! আমার সিনেমা করার
শৈলীগত অধিকার তারা রাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে গেলো ...
জানবেন...বাস্তবতা আমাকে বন্দীদশা ও বন্দী কর্তার
অধীন করলেও আমি জেগে থাকবো আপনাদের সিনেমায় .. আমার স্বপ্নের প্রকাশ দেখার জন্য
,আশা করি তা খুঁজেও পাবো যা থেকে আমি বঞ্চিত রইবো সামনের দিনগুলিতে। ”
১.০
২০১০ সনের ২০ ডিসেম্বর ইরানের বিপ্লবী সরকার
কর্তৃক আরোপিত ছয় বছরের জেল সাজাসহ কুড়ি বছরের নির্বাসন জীবন শুরুর প্রাক্কালে
এটাই ছিল জাফর পানাহির শেষ খোলা চিঠি । ২০১১ সনের
বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের একষট্টি তম সংস্করণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের
মঞ্চে চিঠিটি পাঠ করা হয় । পানাহির মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের অর্গল আঁটানোর
সংবাদে সিনেমা জাহানের তাবৎ প্রাণী ৪৪০ ভোল্টের শক খায় যেন ! প্রকাশ থাকুক, এ
বছরকার বার্লিন উৎসবের সংস্করণে পানাহি অন্যতম আন্তর্জাতিক জুরি হিসেবে আমন্ত্রিত
ছিলেন । ৪৪০ ভোল্টের শকড্ টা কাটায় উঠা মাত্রই অবনীর পরে
নিন্দা-প্রতিবাদের রোল পড়ে যায়; কিন্তু,হায় কুম্ভকর্ণের ঘুম কে ভাঙ্গাতে জানে !!
মূহুর্মূহ প্রতিবাদ,বিক্ষোভের একবর্ণও আহমেদিনিজাদ সরকারের কর্ণকুহরে প্রবেশিল না
। তারা বরং দেশের নিরাপত্তা বিধানের অজুহাতে ঈমানী জোশে হাজতি পানাহির উপর একহাত
ঝেড়ে নিলো ... কি বলবেন বলুন ! কিছু বলার আছে ?!?
২.০
পানাহির সাথে প্রথম পরিচয় ২০০৫ সালের কিছু আগে পরে
তাঁর তালায়ি সোর্খ বা ক্রীমসন গোল্ড (২০০৩) ছবিটার মধ্যে দিয়া এবং
বলাই বাহুল্য তা ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সংসদের আয়োজনে । তো,এর আগেই
ইরানি সিনেমা নিয়ে একপ্রকার বোঝাপড়া ছিল মনে মনে...বিটিভি তে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই
বিভিন্ন সময় প্রচারিত কখনো পুরোটা আবার কখনো আধটা ইরানি সিনেমা দেখে দেখে । কিন্তু,
ক্রীমসন গোল্ড এর আলাপের সুরটা যেন একটু অপরিচিত-ই ঠেকলো। বোকাবাক্স আমারে যে ইরানি
ছবি দেখতে শেখায়ছিলো পানাহির ছবি ঐ তুলনায় অধিক জীবন্ত ! ইরানি সিনেমায় যে এইরকম
আধান [চার্জ] আছে এই নাদান সিনেমাহলিক পয়লাবার টের পাইলো ...এরপর শুরু হইলো তালিকা
দীর্ঘ হবার পালা, কালে কালে চিনতে শিখলাম আব্বাস কিয়োরোস্তামি,মহসিন
মাখমলবাফ,সামিরা মাখমলবাফ,রসুল সাদ্মানি সহ আরো অনেক কে, পরিষ্কার করে বললে ‘ইরানি
নিউ ওয়েভ ফিল্ম’এর সহিত বোঝাপড়া,সখ্যতার সূচনা ঘটলো ।
৩.০
পূর্ব আজারবাইজানের মায়েনাহ শহরে ১৯৬০ সনের ১১
জুলাই জন্ম হয় ইরানি নিউ ওয়েভ ফিল্ম মুভমেন্টের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা জাফর
পানাহির । যে বয়সে মানুষের খেলার সঙ্গী হয় যেকোন খেলনাপাতি সেই বয়সে পানাহি পরিচিত হতে শুরু করে ৮ মি.মি.
ক্যামেরার সাথে...ছবি বানানোই ছিল তাঁর খেলা ; কখনো নিজে করছেন আবার কখনোবা অন্যের
জন্য পারফর্মার হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলেন । ক্যামেরার আগু-পিছু করতে করতে বেড়ে উঠা পানাহি
তারুণ্যে ঝুঁকলেন ফটোগ্রাফির প্রতি ।
১৯৮০’র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বাঁধলে
বাধ্যতামূলকভাবে তাকেও মিলিটিরি সার্ভিসে যোগদান করতে হয়। জানেন তো, পানাহি কিন্তু
ময়দানে দুটো রাইফেল বগলদাবা করে ঘুরে বেড়াতো ! যুদ্ধের ময়দানে তাঁর সাথে সাথে ৮ মি.মি. ক্যামেরাটাও যে হাজির হয়েছিল ! আর
ক্যামেরা যখন রাইফেল এ টার্ন নেয় তখন 2D ক্যামেরাও
যে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে তা কি আমরা জানি না ! ফলাফল Yarali
Bashlar (The Wounded Heads, 1988) টাইটেলের প্রামাণ্যচিত্র
।
সার্ভিস ফেরতা পানাহি তেহরানের কলেজ অব সিনেমা
অ্যান্ড টেলিভিশন-এ পাঠ চুকিয়ে ইরানিয়ান টেলিভিশনের জন্য বেশ কিছু ফিল্ম বানালেন
এর মাঝে ১৯৯৪ সনে আব্বাস কিয়োরোস্তামির সাথে সহকারী পরিচালক হিসাবে Through the Olive Trees (1994) নির্মাণ করেন ।
এরপর পানাহিকে আর থামতে হয়নি... Badkonake Sefid (The White Balloon, 1995) এর মাধ্যমে পানাহি নিজের জাতটা চিনিয়ে দেন
বিশ্ববাসীকে । জয় করেন কান চলচ্চিত্র
উৎসবের ক্যামেরা ডি’অর ।
এরপর
The Mirror (Ayneh, 1997)-র জন্য
লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের গোল্ডেন লিওপার্ড, The Circle (2000)-র জন্য ভেনিস
চলচ্চিত্র উৎসবের গোল্ডেন লায়ন, Crimson Gold (2003)-র জন্য কান চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি
পুরস্কার এবং
সর্বশেষ Offside (2006) পায়
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের সিলভার বিয়ার পদক ।
৪.০
আসেন
পাঠক-পাঠিকাবৃন্দ আমরা আবার ফেরত যাই পানাহির গ্রেফতার নাটকে ।
পানাহি
প্রথমবার রাষ্ট্রের কারাগার নামক অতিথিশালায় কোন মামলা বা অভিযোগ ব্যতিরেকে
আপ্যায়িত হন ২০০৯ সনের ৩০ জুলাই। যখন তিনি সপরিবারে তেহরানের গোরস্তানে গ্রিন
পার্টির সমর্থক সঙ্গীতঙ্গ নেদা আগা সুলতানের সমাধিতে আত্মার মাগফেরাত রত ছিলেন;
দিন কতক বাদে বহাল তবিয়তে তাকে খালাস করা হয় তবে পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে
দেশত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় । এমনকি ষাটতম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের
নির্ধারিত বিষয়ে প্যানেল আলোচনায় যোগ দেয়ার আবেদন সরকার খারিজ করে দেয় ।
১
মার্চ ২০১০ সনে সাদা পুলিশ বিনা ওয়ারেন্টে পানাহির বাসস্থান থেকে স্ত্রী,কন্যা এবং
উপস্থিত পনর জন বন্ধু সহ সবাইকে গ্রেফতার করে হাজতে চালান করে দেয় । ৪৮ ঘণ্টা পর
মোহাম্মদ রসূলুফ , মেহেদী পোরমুসু এবং জাফর পানাহি ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয় ।
রসূলুফ এবং মেহেদী ১৭ মার্চ ছাড়া পেলেও পানাহি কে এভিন কারাগারের ২০৯ ওয়ার্ডে আটকে
রাখা হয় । পানাহির গ্রেফতারের বিষয়টি সরকার গণমাধ্যমে স্বীকার করলেও স্পষ্ট কোন
অভিযোগ দেখাতে ব্যর্থ হয় । ১৪ এপ্রিল ২০১০ সনে ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রী জানান যে পানাহি কে
গ্রেফতার করা হয়েছে কারণ “তিনি শাসন ব্যবস্থা বিরোধী প্রোপাগান্ডামূলক ছবি তৈরি করছিলেন
যা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক গভীর চক্রান্ত ।”
মাননীয়
মন্ত্রীর বক্তব্য যে সর্বৈব মিথ্যা তা পরিষ্কার বোঝা যায় পানাহির বিবি তাহিরাহ
সাঈদীর বক্তব্য থেকে, তিনি মধ্য মার্চে বার্তা সংস্থা এএফপি[AFP]-র এক প্রশ্নের জবাবে বলেন “পানাহির
নির্মিয়মান ছবিটার কেন্দ্রে ছিল নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতি বা চাল-চিত্র এবং ছবিটি
নির্মিত হচ্ছিলো বাসার ভিতরে ... তাহলে এখন কিভাবে পানাহি বা তাঁর ছবি রাষ্ট্রে
অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করলো !?!
”
কারাগারে
অপদস্থ করা এবং তাঁর পরিবারকে হুমকি-ধামকি দেওয়ার প্রতিবাদে পানাহি ১৮ মে ২০১০
থেকে আমরণ অনশন শুরু করলে টানা পাঁচ দিনের
মাথায় ২০,০০০ মার্কিন ডলার জামানতের প্রেক্ষিতে তাকে জামিন দেয়া হয় ।
১২
নভেম্বর ২০১০এ কোর্টে দেয়া তাঁর দীর্ঘ আত্ম পক্ষসমর্থনমূলক বক্তব্যের শেষ বাক্যটি
ছিল “আমি একজন ইরানি নাগরিক এবং ইরান-ই আমার শেষ ঠিকানা ।”
প্রায়
ত্রিশ দিনের প্রসিকিউশন শেষে রাষ্ট্র পক্ষের মামলার প্রেক্ষিতে আদালত রায় ঘোষণা
করে ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো ও শান্তি
বিনষ্টকর কর্মে ইন্ধন যোগানো এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ
বিশ বছরের জন্য সিনেমা পরিচালনা,চিত্রনাট্য রচনা এবং ইরানি বা আন্তর্জাতিক
গণমাধ্যমে যেকোনো প্রকার সাক্ষাৎকার প্রদান ও দেশত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা
হল । ’
হাহ্...এই
না হলো একবিংশ শতকের প্রজ্ঞা ! একেই কি বলে সভ্যতা ! এই ক্ষণে কবি রণজিৎ দাশের
লাইনটা মনে পড়ে গেল~ ‘স্বমেহনে প্রশমিত যে উত্তেজনা- তা-ই সভ্যতা ।’
৫.০
জাফর
পানাহি কে এহেন ‘খ্যাতির বিড়ম্বনার’ শিকার কেন হতে হলো ?
উত্তর-
সিনেমা !
পানাহি
ইরানি নিউওয়েভ ফিল্ম আন্দোলনের অন্যতম নির্ভীক নির্মাতা,রাগীও বটে । তাঁর রাগ
কিন্তু সরাসরি ফ্রেমে ফ্রেমে আছড়ে পড়ে নাহ । বরং এক বরফ শীতল স্নায়ুচাপের উদ্রেক
করে । যেমন ধরা যাক, তাঁর ক্রীমসন গোল্ড (২০০৩)-এর মূহুর্তগুলি যেখানে একজন ইরান-ইরাক যুদ্ধ ফেরত সৈনিক সাধারণ জীবনে পিৎজা
ডেলিভারি ম্যান, স্বর্ণের দোকান লুট করতে গিয়ে ঘটনা পরম্পরায় প্রথমে দোকানদারকে
গুলি করে ... পরের বুলেটে নিজের নামটা খোদাই করে নেয় ! তাত্ত্বিকভাবে
নব্য-বাস্তববাদী ঘরানার মাস্টারপিস এই ছবি তত্ত্বের বাইরে আমার চেতনায় বাঙালি আবেগ
ও জার্মান ক্রোধের এক মিশ্র অনুভূতির উন্মেষ ঘটায় ।
পানাহি
প্রতিটা কাজে সমসাময়িক অন্যান্য নির্মাতার তুলনায় নির্ভীকভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী
বিপ্লবী সরকারের শ্যেন নজর উপেক্ষা করে খন্ডিত মূহুর্তমালার ভিতর দিয়ে বর্তমান
ইরানের রূঢ় সামাজিক বাস্তবতা ও প্রকট শ্রেণী ব্যবধান তুলে ধরে থাকেন ।
দ্য
সার্কেল (দায়িরেহ,২০০০)-এ তিনি অস্বাভাবিক স্পর্শকাতরতার সাথে বিদ্যমান সমাজে
নারী নিপীড়নের বাস্তবতা ফ্রেমবন্দী করেছেন । সার্কেলের একটি দৃশ্যের কথা বলা যায়
যেখানে ফ্রি-মিক্সিং পার্টিতে[নারী-পুরুষ উভয়ের অবস্থান অর্থে] জানালার বাইরে থেকে
সিল্যুটেড নারী অবয়ব দেখা যার নাচছে-নিজেদের মত করে আনন্দ করছে । এই নারীকেই কিন্তু
বাকি সময় দেখা যায় মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়ে চলতে,স্ফূর্তিহীন বিষণ্নতায় আক্রান্ত
চেহারা বয়ে বেড়াতে।
দ্য সার্কেল তুলে ধরে নারী-পুরুষের পারাস্পারিক
সামাজিক সম্পর্কের উপর রাষ্ট্রের অনাহূত হস্তক্ষেপের সেই ইমেজাবলী যার কোন অংশ-ই
বানোয়াট নয় পুরোটাই নিয়মিত বাস্তবতা । ইরানের সমাজে যেখানে নারী ধর্মের দোহাই দিয়ে নিরাপত্তার অজুহাতে অদ্ভুত
বেড়াজালে আটকা তারপরও, মানবীয় আকাঙ্ক্ষার
তাড়নায় শত বাধা ও ঝুঁকি সত্ত্বেও তারা মেতে উঠে উৎসবে । এভাবেই পানাহি বিপ্লবি
সরকারের কূপমুন্ডকতার বলিহারি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ।
আরও বলা যেতে পারে বহুল আলোচিত অফসাইড (২০০৬) ছবিটির
কথা । যেখানে একদল ফুটবলপ্রেমী তরুণীর জাতীয় দলকে সমর্থন জানানোর জন্য এবং ফুটবল
উপভোগ করার জন্য স্টেডিয়ামে প্রবেশের ফন্দি-ফিকির করে। যাহোক, এই সিনেমার মূলে
আবারো লিঙ্গের প্রশ্নটি পানাহি উপস্থাপন করেন নতুনভাবে ।
নতুন এই অর্থে যে ,আমরা সাধারণত যা ভেবে থাকি যেমন
(শুধু) ‘নারীরাই তাদের অধিকার এর প্রশ্নে সোচ্চার’ বা ‘মিলিটারি মাত্রই
এলিয়েন’ এই ধারণাগুলির খোলনলচে-তে তিনি বেশ জোরেই একটা বাড়ি মারেন । কারণ ,
ইরানে শুধু নারীরাই নয় পুরুষরাও নিপীড়নের স্বীকার তাই ,নারীমুক্তির প্রশ্নে তারাও
সমান সহানুভূতিশীল সেদিকটি সংলাপের মধ্যে দিয়ে দর্শকের নজরে আনেন তিনি । আর
মিলিটারি পোষাকের যে তরুণকে দেখা যায় তা কোনভাবেই তার আকাঙ্খিত পোষাক নয়...এইটা
বাধ্যতামুলক যে ১৮+ বয়সের সবাইকে আর্মিতে
নাম লেখাতেই হবে ! সেই অর্থে গায়ে উর্দি জড়ালেও মননে সে আর দশজন তরুণের মতই
প্রগতিশীল বা আধুনিক এই চরিত্র নির্মাণের ভেতর দিয়ে মানবিক দিকটি প্রকাশ করেন ...
পানাহি অফসাইড (২০০৬)-এ খানিকটা সিনেমাভেরিতে
শৈলীতে অর্থাৎ ডকুমেন্টারি আঙ্গিকে কাহিনীচিত্রের আনুষাঙ্গিক জুড়ে দিয়ে বিচিত্র এক
টেনশনের পরিচলন ঘটিয়েছেন পুরা সিনেমা জুড়ে । এবং অবধারিতভাবে প্রচলিত [আরোপিত]
সমাজ ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন ।
এইদিক
থেকে পানাহি তাঁর সহকর্মী বাস্তববাদী নির্মাতা আব্বাস কিয়োরস্তামির চাইতে
পরিপূর্ণভাবে সামাজিক অধিবিচারে আগ্রহী ,একরোখাও বটে ।
৬.০
তাহলে,
পাঠক [দর্শক] এইটা বলা যায় যে, জাফর পানাহির সিনেমাকে রাজনৈতিক সিনেমা বলার
উপায় নাই বরং আমল করা যেতে পারে একটা শার্সি বা আয়নার মত ; কারণ তার সিনেমার
মানুষগুলি কেউ কিন্তু কখনো রাজনীতিকদের মত বলে না “এটা করো বা ওটা করো নাহ !” বরং,
পানাহি তার সিনেমায় মানুষের ক্লেশলাঘব স্বাভাবিক ঘটনা প্রবাহের ভাষ্য কাব্যিক ও
শৈল্পিক লক্ষণায় রূপায়ণ করেন মাত্র । এবং এর মধ্যদিয়ে সমাজের
বর্তমান হালের প্রতিবিম্ব শাসকগোষ্ঠির নজরে আনতে চান ।
হ্যাঁ,এইখানেই
যত গোস্বা সরকাররাজের !!
কেন,পানাহি
মিষ্টি মিষ্টি ছবি না তুলে,ইলিশ ইলিশ স্মৃতির বয়ান না করে এইসব ফোটো উঠায় ! এইটা
কিছু হইলো ? পানাহির উপর আলবৎ শয়তান নাযেল হইছে আর এই শয়তান পানাহির ভেক ধরে দেশের
শান্তি নাশ কইরা ফেলবে...পানাহিকে আরেকবার ইরানি হবার সুযোগ করে দেয়াটা রাষ্ট্রের
কর্তব্য ।।
আর,তাই
পানাহি জেলে আর আপন সন্তানের মতিভ্রম রোধ করতে পেরে সরকাররাজের দিলখোশ!
৭.০
জাফর
পানাহিদের মত নির্মাতাদের মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠা এই স্বাধীন ধারার,
সমালোচনাবাদী ভিন্নমতাশ্রয়ী নির্মাতাগণ রাষ্ট্রের মিথ্যাভাষণ ও
বিচারবুদ্ধিহীন/অযৌক্তিক ক্রিয়াকর্মের বিরুদ্ধে সন্তর্পণে অন্যস্বরের যে আওয়াজ
তুলেছেন তা সহসাই নিস্তব্ধ হওয়ার নয় । জানি,পানাহির [নতুন] ছবি আমরা আগামী বিশ বছর
দেখতো পাবো না ; এতে হয়তো শাসককূল আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারেন কিন্তু আমরাও
জানি কী উপায়ে আগামী কল্য চলে যেতে হয় গত কল্যের দেশে !! সেই দেশে পানাহির সাথে
পুনরায় যে মোলাকাত হবে তা বিলক্ষণ জানি । কেননা,আশ্চর্য পথে কোথাও দেখার মত আজো যে
কিছু রয়ে গেছে ...
সংযুক্তিঃ
পানাহির খোলা চিঠির লিঙ্ক http://www.berlinale.de/en/das_festival/festivalprofil/berlinale_themen/openletterpanahi.html
২৬-২৯
এপ্রিল ২০১১, মাকাসার,ইন্দোনেশিয়া।